চট্টগ্রাম বন্দরের জিসিবি (জেনারেল কার্গো বার্থ) এলাকায় কনটেইনার জাহাজে অনবোর্ড হ্যান্ডলিং রেট যৌক্তিক হারে বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কার্যকর না করায় শিপিং এজেন্টদের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। শিপিং এজেন্টদের সঙ্গে বার্থ অপারেটরদের এ দ্বন্দ্বের জেরে জিসিবির ছয়টি জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজ ধীরগতিতে চলছে, ফলে ব্যাহত হচ্ছে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম। এমন পরিস্থিতিতে বিষয়টি দ্রুত সমাধানের জন্য নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়ে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)।
গত ৭ এপ্রিল নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, অনবোর্ড কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য বার্থ অপারেটরদের প্রতি বক্স কনটেইনার ভিত্তিতে যে রেট দেয়া হয়, তা যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য হারে বাড়ানোর বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চললেও এখনো কোনো সুরাহা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে এর আগেও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)।
চিঠিতে বলা হয়, গত ৯ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্যের (হারবার ও মেরিন) সভাপতিত্বে বার্থ অপারেটর এবং শিপিং এজেন্টদের অংশগ্রহণে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উভয় পক্ষের প্রস্তাবিত রেটের মধ্যে বিস্তর ফারাক থাকায় চবকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করে বিদ্যমান রেটের সঙ্গে প্রতি কনটেইনারে ২০৫ টাকা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বার্থ অপারেটররা তাৎক্ষণিকভাবে ওই সিদ্ধান্তে সম্মতি দিলেও শিপিং এজেন্টরা তা এখনো বাস্তবায়ন করেনি।
চবকের চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়, গত ২৭ মার্চ কনটেইনার শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অনবোর্ড হ্যান্ডলিং রেটের ওপর মাত্র ৫০ টাকা ৩৬ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়। এতে সংশ্লিষ্ট বার্থ অপারেটররা একমত নাও হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ। এর ফলে বন্দরের জিসিবি এলাকায় কনটেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে এবং জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম বেড়ে যেতে পারে, যা আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে ধীরগতি সৃষ্টি করতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুই পক্ষের সঙ্গে বারবার বৈঠকের পরও সমস্যার সমাধান না হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) যৌক্তিক জায়গায় একটা দর ঠিক করে দিয়েছে। কিন্তু শিপিং এজেন্টদের পক্ষ থেকে সে নির্দেশনাও মানা হচ্ছে না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নৌ মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে এবং পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার স্বার্থে বন্দর কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত যৌক্তিক রেটে বার্থ অপারেটরদের পারিশ্রমিক প্রদানের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।’
বার্থ অপারেটরদের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরকে এর আগে দেয়া চিঠিতে খরচের বিবরণীতে বলা হয়, প্রতি কনটেইনারে বার্থ অপারেটরদের ৩৫৩ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে শিপিং এজেন্টদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রতি কনটেইনারে বার্থ অপারেটররা ৬৬২ টাকা লাভ করছেন।
অনবোর্ড কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ বাড়ানো নিয়ে বার্থ অপারেটর ও শিপিং এজেন্টদের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব তীব্র হয় গত জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। ওই সময় বার্থ অপারেটররা প্রতি কনটেইনারে পাঁচ ডলার করে বাড়তি দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে শিপিং এজেন্টদের চিঠি দেয়। এ বিষয়ে বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, ২০০৭ সাল থেকে অনবোর্ড হ্যান্ডলিং চার্জ বাড়ানো হয়নি। অথচ শ্রমিক মজুরিসহ অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় পুরনো রেটে কাজ চালানো অসম্ভব।
চট্টগ্রাম বন্দর বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০০৭ সাল থেকে সংস্কারের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরে বার্থ অপারেটিং সিস্টেম চালু হয়েছে। সরকারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও শিপিং এজেন্টরা জাহাজের অনবোর্ড অপারেশনে প্রতি কনটেইনারে অপারেটরদের ৬০ শতাংশ সার্ভিস চার্জের ওপর ১ শতাংশ সার্ভিস চার্জও বাড়ায়নি, যেখানে তারা প্রতি কনটেইনারে শ্রমিকদের সার্ভিস চার্জ প্রতি বছরান্তে ১০ শতাংশ বাড়ায়। সময় হিসেবে অনেক কিছুর দাম বেড়েছে। তাই ২০০৭ থেকে ২০২৫ সালের দীর্ঘ সময় বিবেচনায় নিয়ে আমরা চার্জ বাড়াতে বলেছি।’
শিপিং এজেন্টরাও এ রেট বাড়ানোর বিরোধিতা করে পাল্টা যুক্তি তুলে ধরেছেন। তারা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের জিসিবি টার্মিনালের ছয়টি জেটিতে ক্রেইন যুক্ত (গিয়ার্ড) কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানো হয়। বাকি ছয়টি জেটিতে ভেড়ানো হয় ক্রেইন ছাড়া বা গিয়ারলেস জাহাজ। একটি গিয়ার্ড জাহাজে দুটি ক্রেইন থাকলে দুই গ্যাংগ শ্রমিক ও কমপক্ষে ১২টি ট্রেইলার সরবরাহ করে থাকে বার্থ অপারেটররা। এ সংখ্যা সম্প্রতি অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে বার্থ অপারেটররা। এতে করে জাহাজে কনটেইনার ওঠা-নামার কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। ফলে এসব জাহাজকে অতিরিক্ত এক-দুইদিন বেশি সময় জেটিতে থাকতে হচ্ছে।
শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটা একটা অযৌক্তিক প্রস্তাব। বার্থ অপারেটররা এখানে এককভাবে চার্জ বাড়াতে বলেছে, আমরা এর বিরোধিতা করে আসছি। বার্থ অপারেটররা ২০১৬ সাল থেকে অন বোর্ড হ্যান্ডলি়ং চার্জের ৪০ শতাংশের ওপর প্রতি বছর বাড়িয়ে আসছেন। আমরা আগে ইচ্ছেমতো বার্থ অপারেটর নিয়োগ করতে পারতাম, এখন পারছি না। তারা নিজেদের মতো কাজ করে, ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপারে কোনো দায় নেয় না। গত ১৫ বছর ধরে তারা মনোপলি ব্যবসা চালিয়েছে।’ বর্তমানে ওপেন টেন্ডারের কথা বলা হচ্ছে, এটা হলে চার্জ অনেক কমে আসবে বলেও জানান তিনি।